মেসেজের মাধ্যমে স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার বিধান

তালাকের বিধিবিধান , তালাকে মুগাল্লাযা ও হালালাহ ,মেসেজের মাধ্যমে স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার বিধান

Fatwa No :
726
| Date :
2026-09-09
মুআমালাত / তালাকের বিধিবিধান / তালাকে মুগাল্লাযা ও হালালাহ

মেসেজের মাধ্যমে স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার বিধান

একজন স্বামী নিজ স্ত্রীকে মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে তালাক দিলাম, তালাক দিলাম, তিন তালাক দিলাম লিখেছে। এখন এটা কী একবার কাউন্ট হবে নাকি তিন তালাক হয়ে গেছে? এখন তারা যদি সংসার করতে চায় সেক্ষেত্রে শরীয়ত কী বলে?

الجوابُ حامِدا ًو مُصلیِّا ً وَمُسَلِّمًا

বিবাহিত প্রত্যেক নারী-পুরুষের জন্য বিবাহ, তালাক ও দাম্পত্য সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের শরীয়তের মৌলিক বিধান জেনে নেওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে অবহেলা করা গুনাহ। উপরন্তু এ বিষয়ে অবহেলা সংসার জীবনে অনেক সময় কঠিন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গুনাহ ও বিপদ থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ হলেও শরীয়তের বিধান জেনে নেওয়া কর্তব্য।
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এবং তাদের মাঝে গভীর ভালোবাসা বিশেষভাবে কাম্য। কেননা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রভাব পরিবার, সংসার, সন্তানসহ আরও অনেক কিছুর উপর পড়ে। আর কোন সন্দেহ নেই যে, দাম্পত্য হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। এজন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আন্তরিকতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে একে অপরকে ছাড় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যত্যয় ঘটলে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। এমনকি তা কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাক পর্যন্ত গড়ায়। উল্লেখ্য, শরীয়তে তালাক মোটেও কাম্য নয়। এজন্যই শরীয়তে তালাককে বৈধ কাজের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ বলা হয়েছে। আর তালাক এমন স্পর্শকাতর বিষয় যা বলে ফেললে আর বাতিল করা যায় না এবং লিখিত কিংবা মৌখিক, স্ত্রীকে শুনিয়ে কিংবা না শুনিয়ে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে, রাগান্বিত হয়ে কিংবা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অথবা বাধ্য হয়ে চাপে পড়ে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে দিলেও তা পতিত হয়ে যায়। চাই স্ত্রী হায়েজ অবস্থায় থাকুক অথবা পবিত্র অবস্থায় থাকুক। তাই শরীয়ত কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় স্ত্রীকে সতর্ক ও সংশোধন করার যেসব পদ্ধতি রয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব প্রয়োগ না করেই তালাক দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে কখনো তালাক দিলেও যেহেতু বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য এক তালাকই যথেষ্ট, তাই কোন পরিস্থিতিতেই তিন তালাক না দেওয়া কর্তব্য। কেননা তিন তালাক দিলে আর স্বাভাবিকভাবে বিবাহের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। উপরন্তু এ কারণে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা থেকে উত্তরণের কোন উপায় থাকে না। আর যারা বলে একসাথে তিন তালাক দিলে এক তালাক পতিত হয়, গর্ভাবস্থায় তালাক দিলে তালাক পতিত হয় না ইত্যাদি—তাদের এসব কথা সম্পূর্ণ ভুল ও কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী। তাই এসব কথা কর্ণগোচর করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করার চেয়ে পরকালের আজাব অনেক কঠিন। এই কথাগুলো ভালোভাবে বুঝার পর কথা হলো এই যে, প্রচন্ড রাগের সময় আবেগপ্রবণ অবস্থায় তালাক দেওয়ার কোন পূর্ব পরিকল্পনা বা বিবাহবিচ্ছেদের ইচ্ছা ছাড়াও কোন স্বামী নিজ স্ত্রীকে লক্ষ্য করে মেসেজের মাধ্যমে তালাক লিখলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক পতিত হয়ে যায়। সুতরাং, প্রশ্নোল্লিখিত সুরতে প্রশ্নকারী তার স্ত্রীকে মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে "তালাক দিলাম, তালাক দিলাম, তিন তালাক দিলাম" লেখার দ্বারা প্রশ্নকারীর স্ত্রীর উপর সর্বমোট তিনটি তালাকই পতিত হয়ে প্রশ্নকারী ও তার স্ত্রী একে অপরের জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে গেছে। তাই তালাকের পর থেকে তাদের পরস্পরের মাঝে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। এবং পূর্বের ন্যায় দেখা-সাক্ষাৎ, মেলামেশা, তথা স্বামী-স্ত্রী সুলভ সকল প্রকার আচরণ তাদের জন্য হারাম। আর স্বামীর জন্য স্ত্রীর ইদ্দতকালীন সময়ের তথা তালাক পরবর্তী তিন মাসিক শেষ হওয়া পর্যন্ত, গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত আর উভয়টির কোনটি না হলে তিন মাস পর্যন্ত খোরপোশ দেওয়া এবং মোহর (আংশিক কিংবা পূর্ণ) আদায় না করে থাকলে তা আদায় করা ওয়াজিব।
শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এখন তাদের বিবাহ বৈধ নয়। তবে যদি তিন তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর, স্ত্রী অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়, তারপর ওই স্বামী মারা যায় বা কোন কারণে তাকে তালাক দেয়—তাহলে দ্বিতীয় স্বামীর তালাক বা মৃত্যুজনিত ইদ্দত পালনের পর পূর্বের স্বামী ও সে উভয়ে সম্মত থাকলে নতুন করে মোহর নির্ধারণ করে শরীয়তসম্মত পন্থায় বিবাহ করতে পারবে। এছাড়া তাদের ঘর-সংসার করার অন্য কোন পথ বৈধ নয়।

مأخَذُ الفَتوی

قال الله تعالى: ﴿فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ﴾ (سورة البقرة، الآية: 230)-
وفي تفسير روح المعاني: "فإن تعقيبه للخلع بعد ذكر الطلقتين يقتضي أن يكون طلقة رابعة لو كان الخلع طلاقا، وإليه ذهب أصحابنا، فحينئذٍ يكون ﴿فَإِنْ طَلَّقَهَا﴾ مُتَعَلِّقاً بقوله سبحانه وتعالى: ﴿الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ﴾." (ج12، ص737، ط: دار الحديث)-
وفي صحيح البخاري: عن عروة بن الزبير، أن عائشة رضي الله عنها أخبرته: «أن امرأة رفاعة رضي الله عنها جاءت إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقالت: يا رسول الله! إن رفاعة طلقني فبتّ طلاقي، وإني نكحت بعده عبد الرحمن... (إلى قوله) قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لعلك تريدين أن ترجعي إلى رفاعة؟ لا، حتى يذوق عسيلتك وتذوقي عسيلته». (باب من أجاز الطلاق الثلاث، ج3، ص2182، ط: المكتبة الإسلامية)-
وفي سنن الترمذي: عن أبي هريرة رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «ثلاث جدهن جد وهزلهن جد: النكاح والطلاق والرجعة». (باب ما جاء في الجد والهزل في الطلاق، ج2، ص697، رقم: 1168، ط: المكتبة الإسلامية)-
وفي الهداية: وإن كان الطلاق ثلاثاً في الحرة أو اثنتين في الأمة، لم تحل له حتى تنكح زوجاً غيره نكاحا صحيحا و يدخل بها ثم يطلقها أو يموت عنها. والأصل فيه قوله تعالى: ﴿فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ﴾ والمراد الطلقة الثالثة." (كتاب الطلاق، باب الرجعة، ج3، ص226، ط:المكتبة البشرى)-
وفي البدائع: وأما الطلقات الثلاث فحكمها الأصلي وهو زوال الملك وزوال حل المحلية أيضا حتى لا يجوز له نكاحها قبل التزويج بزوج آخر لقوله عز وجل: ﴿فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ﴾ وسواء طلقها ثلاثا متفرقا أو جملة واحدة." (كتاب الطلاق، ج4، ص407، ط:مكتبة رشيدية)-
وفيه أيضاً: وإن كتب كتابا مرسوما على طريق الخطاب والرسالة مثل أن يكتب: أما بعد يا فلانة فأنت طالق، أو إذا وصل كتابي إليك فأنت طالق، يقع به الطلاق." (فصل في النوع الثاني، ج4، ص243، ط:مكتبة رشيدية)-
وفي المحيط البرهاني: الأول أن يكتب: هذا كتاب فلان ابن فلان إلى فلانة، أما بعد فأنت طالق، وفي هذا الوجه يقع الطلاق عليها في الحال." (كتاب الطلاق، الفصل السادس، ج4، ص484، ط: إدارة التراث)-
وفي الفقه الإسلامي وأدلته: والبائن بينونة كبرى: وهو الذي لا يستطيع الرجل بعده أن يعيد المطلقة إلى الزوجية إلا بعد أن تتزوج بزوج آخر زواجا صحيحا، ويدخل بها دخولا حقيقيا ثم يفارقها أو يموت عنها وتنقضي عدتها منه، وذلك بعد الطلاق الثلاث حيث لا يملك الزوج أن يعيد زوجته إليه إلا إذا تزوجت بزوج آخر." (كتاب الطلاق، ج7، ص414، ط:مكتبة رشيدية)-
وفي جدید فقہی مسائل: دوسری ضروری بات یہ ہے کہ بیوی کی طرف طلاق کی نسبت کی جائے اس طور پر کہ لکھنے میں 'فلاں خاتون کو طلاق دیا' یا عورت کو مخاطب کرتے ہوئے لکھا جائے 'میں نے تم کو طلاق دی' تو اس کو فقہی اصطلاح میں کتابتِ مرسومہ کہتے ہیں۔ اب اگر خط یا میسج وغیرہ میں اس نے لکھا 'میں نے فلاں کو یا تم کو طلاق دی' تو لکھنے کے ساتھ ہی طلاق واقع ہو جائے گی۔" (فون وغیرہ پر طلاق، ج2، ص63، ط: المكتبة الحجاز)-
وفي فتاوى عثمانی: جس طرح زبانی طلاق واقع ہو جاتی ہے، اسی طرح اگر ایک شخص طلاق کی نیت سے خط کے ذریعے بیوی کو طلاق کے الفاظ لکھے تو اس سے بھی طلاق واقع ہو جاتی ہے۔" (مسألة الطلاق بالكتابة، ج2، ص187، ط: مكتبة العصر)-

واللہ تعالی أعلم بالصواب
عمير شهادت عُفی عنه
دار الإفتاء الجامعة البنورية الإسلامية

Fatwa No 726 Verify Now
0     7
Related Fatawa Related Fatawa
...
Related Topics Relative Topics