আসসালামু আলাইকুম আমার স্ত্রীর সাথে আমার ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমি তাকে বলি তুই এক তালাক এবং আমি সাথে সাথে আল্লাহর কাছে তওবা করি এবং তার কাছে মাফ চাই এবং আমরা আবার স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে বসবাস করি। আমি আমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসি এবং আমি তাকে কখনো তালাক দিব না। এটা তাকে আমি অনেকবার বলি ও মাঝেমধ্যে ঝগড়া হলে সে আমায় বলে কাগজপত্র দিয়ে দেন, আমি চলে যাই। আমি তাকে বলি আমি কোনদিনও কাগজপত্র দিব না তোমাকে। যদি থাকতে মন না চায় তাহলে তুমি কাগজপত্র দিয়ে চলে যাও। আসলে আমরা কেউ কাউকে তালাক দিতে চাই না এবং ছেড়ে যেতে চাইনা। তারপর ভালোভাবেই দিন কাটতে থাকে। আবার তার সাথে আমার ঝগড়া হলে আমি তাকে সংশোধন করার জন্য বলি তুই এক তালাক, আমি আসলে জানিনা আগে যে একবার বলছি এক তালাক সেটাও আছে। আমি মনে করছিলাম আমি তো তওবা করে নিয়েছি সেটা আর নেই। তো আবার সংসার চলতে থাকে। বর্তমানে দুইদিন ধরে আমার স্ত্রীর সাথে আমার মনোমালিন্য হচ্ছিল এবং সে আমায় বাসা চেঞ্জ করতে বলতেছে আরো অনেক আগে থেকেই। বলে বাসা চেঞ্জ করতে কিন্তু আমি কিছু বাস্তব সমস্যার কারণে বাসা চেঞ্জ করতে পারছি না। তাই আমি শুধু তাকে বলি তুমি বাসা দেখো। পরে সে আমাকে বলে, যদি না পারেন তাহলে আর রাখার দরকার কি ছেড়ে দিলেই তো পারেন। তখন আমি তাকে চুপ করানোর জন্য এবং যেনো সে তর্ক না করে সেজন্য আমি তাকে বলি, যা ছেড়ে দিলাম চলে যা। আমি তাকে তালাকের উদ্দেশ্য করে বা ছাড়ার উদ্দেশ্য করে বলিনি আমি শুধু চুপ করানোর জন্য এবং যেন তর্ক না করে সেজন্যই বলেছি । আর আমি জানি না যে ছেড়ে দিলাম বললে শরিয়ার কোন প্রভাব থাকতে পারে। এখন আমি জানতে চাই আমারা কি স্বামী স্ত্রী হিসাবে আছি?
বিবাহিত প্রত্যেক নারী পুরুষের জন্য বিবাহ তালাক ও দাম্পত্য সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের শরীয়তের মৌলিক বিধান জেনে নেওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে অবহেলা করা গুনাহ। উপরন্তু এ বিষয়ে অবহেলা সংসার জীবনে অনেক সময় কঠিন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গুনাহ ও বিপদ থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ হলেও শরীয়তের বিধান জেনে নেওয়া কর্তব্য। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তাদের মাঝে গভীর ভালোবাসা বিশেষভাবে কাম্য। কেননা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রভাব পরিবার, সংসার, সন্তানসহ আরো অনেক কিছুর উপর পড়ে। আর কোন সন্দেহ নেই যে, দাম্পত্য হলো দ্বী-পাক্ষিক সম্পর্ক । যা স্থায়ী হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আন্তরিকতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে একে অপরকে ছাড় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যত্যয় ঘটলে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। এমনকি তা কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাক পর্যন্ত গড়ায়। উল্লেখ্য, শরীয়তে তালাক মোটেও কাম্য নয়। এজন্যই শরীয়তে তালাককে বৈধ কাজের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ বলা হয়েছে। আর তালাক এমন স্পর্শকাতর বিষয় যা বলে ফেললে আর বাতিল করা যায় না এবং লিখিত কিংবা মৌখিক, স্ত্রীকে শুনিয়ে কিংবা না শুনিয়ে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে, রাগান্বিত হয়ে কিংবা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় অথবা বাধ্য হয়ে চাপে পড়ে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে দিলেও তা পতিত হয়ে যায়। চাই স্ত্রী হায়েজ অবস্থায় থাকুক অথবা পবিত্র অবস্থায় থাকুক। তাই শরীয়ত কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় স্ত্রীকে সতর্ক ও সংশোধন করার যেসব পদ্ধতি রয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব প্রয়োগ না করেই তালাক দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে কখনো তালাক দিলেও যেহেতু বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য এক তালাকই যথেষ্ট। তাই কোন পরিস্থিতিতেই তিন তালাক না দেওয়া কর্তব্য। কেননা তিন তালাক দিলে আর স্বাভাবিকভাবে বিবাহের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। উপরন্তু এ কারণে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা থেকে উত্তরণের কোন উপায় থাকে না। আর যারা বলে একসাথে তিন তালাক দিলে এক তালাক পতিত হয়, গর্ভবস্থায় তালাক দিলে তালাক পতিত হয় না ইত্যাদি। তাদের এসব কথা সম্পূর্ণ ভুল ও কোরআন সুন্নাহ পরিপন্থী। তাই এসব কথা কর্ণগোচর করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক দুঃখ কষ্ট ভোগ করার চেয়ে পরকালের আজাব অনেক কঠিন।
এই কথাগুলো ভালোভাবে বুঝার পর কথা হলো এই যে, তালাক দেওয়ার পর তওবা করা বা স্ত্রীর কাছে মাফ চাওয়ার দ্বারা তালাক বাতিল হয়ে যায় না। বরং তা আপন অবস্থায় বহাল থাকে। তাই প্রশ্নোল্লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী, প্রশ্নকারী প্রথমবার ঝগড়ার এক পর্যায়ে “তুই এক তালাক” বলার দ্বারা এক তালাক এবং একপর্যায়ে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে “তুই এক তালাক” বলার দ্বারা দ্বিতীয় তালাক পতিত হয়ে গেছে। আর বর্তমানে বাসা চেঞ্জ নিয়ে মনোমালিন্য ও ঝগড়ার এক পর্যায়ে, স্ত্রীর বক্তব্যঃ “রাখার দরকার কি ছেড়ে দিলেই তো পারেন” এর জবাবে প্রশ্নকারীর “যা ছেড়ে দিলাম চলে যা” বলার দ্বারা তৃতীয় তালাকটিও পতিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রশ্নকারীর স্ত্রীর উপর সর্বমোট তিনও তালাক পতিত হয়ে প্রশ্নকারী ও তার স্ত্রী একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে। তাই তালাকের পর থেকে তাদের পরস্পরের মাঝে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। এবং পূর্বের ন্যায় দেখা-সাক্ষাৎ, মেলামেশা, তথা স্বামী স্ত্রী সুলভ সকল প্রকার আচরণ তাদের জন্য হারাম। আর স্বামীর জন্য স্ত্রীর ইদ্দতকালীন সময়ের তথা তালাক পরবর্তী তিন মাসিক শেষ হওয়া পর্যন্ত গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত আর উভয়টির কোনটি না হলে তিন মাস পর্যন্ত খোরপোষ দেওয়া এবং মোহর (আংশিক কিংবা পূর্ণ) আদায় না করে থাকলে তা আদায় করা ওয়াজিব। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এখন তাদের পুনর্বিবাহ বৈধ নয়। তবে যদি তিন তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর স্ত্রী অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্কও হয় তারপর ঐ স্বামী মারা যায় বা কোন কারণে তাকে তালাক দেয়, তাহলে দ্বিতীয় স্বামীর তালাক বা মৃত্যুজনিত ইদ্দত পালনের পর পূর্বের স্বামী ও সে উভয়ে সম্মত থাকলে নতুন করে মোহর নির্ধারণ করে শরীয়ত সম্মত পন্থায় বিবাহ করতে পারবে। এছাড়া তাদের ঘর সংসার করার অন্য কোন পথ বৈধ নয় ।
قال الله تعالى: {فإن طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره فإن طلقها فلا جناح عليهما أن يتراجعا إن ظنا أن يقيما حدود الله وتلك حدود الله يبينها لقوم يعلمون} (سورة البقرة، الآية:230)-
وفي روح المعاني: فإن تعقيبه للخلع, بعد ذكر الطلقتين يقتضي أن يكون طلقة رابعة, لو كان الخلع طلاقا . وإليه ذهب أصحابنا فحينئذ يكون {فان طلقها} فتعلق بقوله سبحانه وتعالى {الطلاق مرتان} (ج:12, ص:737 , ط: دار الحديث)-
وفي صحيح البخاري: {عن عروة ابن الزبير أن عائشة (رضي) أخبرته أن امراة رفاعة جاءت إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم. فقالت: يا رسول الله! إن رفاعة طلقني, فبدت طلاقي وإني نكحت بعده عبد الرحمن(إلى قوله) "قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لعلك تريدين أن ترجعي إلى رفاعة, لا حتى يذوق عسيلتك وتذوق عسيلته"} (باب من أجاز الطلاق الثلاث, ج:3, ص:2182, ط: مكتبة الإسلامية)-
وفي سنن الترمذي: عن أبي هريرة رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ثلاث جدهن جد وهزلهن جد: النكاح والطلاق والرجعة
(باب ما جاء في الجد والهزل في الطلاق, ج:2, ص:697, رقم :1168، ط:مكتبة الإسلامية)-
وفي الهداية: وإن كان الطلاق ثلاثا في الحرة أو ثنتين في الأمة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا, يدخل بها ثم يطلقها أو يموت عنها. والأصل فيه قوله تعالى: {فان طلقها فلا تحل له من بعده حتى تنكح زوجا غيره} والمراد الطلقة الثالثة. (كتاب الطلاق, باب الرجعة، ج:3، ص:226 ، ط: البشرى)-
وفي البدائع: وأما الطلقات الثلاث فحكمها الأصلي وهو زوال الملك و زوال حل المحليه أيضا حتى لا يجوز له نكاحها قبل التزويج بزوج آخر لقوله عز وجل: {فان طلقها فلا تحل} وسواء طلقها ثلاثا فتفرقا أو جملة واحدة. (كتاب الطلاق: ج:4 ص:407 ط:مكتبة رشيدية)-
وفي رد المحتار: فإذا قال "رها كردم" أي "سرحتك" يقع به الرجعي مع أن أصله كناية أيضا وما ذاك إلا أنه غلب في عرف الناس استعماله في الطلاق. فقد مر أن صريح ما لم يستعمل إلا في الطلاق من أي لغة كانت. (كتاب الطلاق, ج:4، ص:530، ط:دار المعرفة)-
وفي الفقه الإسلامي وأدلته: والبائن بينونة كبرى: وهو الذي لا يستطيع الرجل بعده أن يعيد المطلقة إلى الزوجية إلا بعد أن تتزوج بزوج آخر زواجا صحيحا, ويدخل بها دخولا حقيقا ثم يفارقها أو يموت عنها وتنقض عدتها منه وذلك بعد الطلاق الثلاث حيث لا يملك الزوج أن يعيد زوجيته إليه إلا إذا تزوج بزوج آخر. (كتاب الطلاق: ج:7, ص:414, ط،مكتبة رشيدية)-
وفی کتاب النوازل: اور طلاق بائن کا مطلب یہ ہوتا ہے کہ عدت کے اندر ,یا عدت کے بعد نکاح جدید کے بغیر بیوی سے رجوع کا حق نہ رہے بائن ہی کی ایک قسم مغلظہ (تین طلاق) ہیں جن میں حلالہ کی بغیر رجوع کا حق نہیں رہتا. اگر ایک یا دو طلاق بائن دے جائے تو نکاح جدید کے لیے حلالہ کے ضرورت نهی هوتی ہے ۔ (طلاق صريح ,حکم الصريح, ج:9، ص:251، ط:دارالإشاعت)-
وفي فتاویٰ عثمانی: اور کوئی شخص بیوی کو کہے کہ میں نے تمہیں چھوڑ دیا. تو راجح یہ ہے کہ اردو محاورے میں یہ صريح لفظ ہے۔ (کتاب الطلاق: ج:2، ص:325 ، ط: زكريا)-