আসসালামু আলাইকুম! মুফতি সাহেব! কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলল “তুমি এক তালাক” আর যদি তুমি এক মাসের মধ্যে রোজা-নামাজ ও খাস পর্দা না কর, তাহলে “তুমি তিন তালাক”। অতঃপর তার স্ত্রী এক মাসের মধ্যে রোজা-নামাজ ও খাস পর্দা করলো না। এখন শরিয়তের দৃষ্টিতে কয় তালাক হবে ? উল্লেখ্য যে, উক্ত ঘটনার পূর্বে ঐ ব্যক্তির ২ জন সন্তান ছিল এবং পরবর্তীতে আরো ৩ জন সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। যদি তালাক হয়ে থাকে তাহলে এই সন্তানদের বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী?
বিবাহেচ্ছুক প্রত্যেক নারী-পুরুষের জন্য বিবাহ-তালাক ও দাম্পত্য সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে শরিয়তের মৌলিক বিধান জেনে নেওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে অবহেলা করা গুনাহ। উপরন্তু এ বিষয়ে অবহেলা সংসার জীবনে অনেক সময় কঠিন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গুনাহ ও বিপদ উভয় থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ হলেও শরিয়তের বিধান জেনে নেওয়া কর্তব্য । ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক, তাদের মাঝে গভীর ভালোবাসা বিশেষভাবে কাম্য। কেননা স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্কের প্রভাব পরিবার, সংসার, সন্তানসহ আরো অনেক কিছুর উপর পড়ে। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, দাম্পত্য হলো দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক দৃঢ় ও উন্নত হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আন্তরিকতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে একে অপরকে ছাড় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যত্যয় ঘটলে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে, এমনকি তা কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাক পর্যন্ত গড়ায়। উল্লেখ্য, শরিয়তে তালাক মোটেও কাম্য নয়। এ জন্যই শরিয়তে তালাককে বৈধ কাজের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ বলা হয়েছে। আর তালাক এমন স্পর্শকাতর বিষয়, যা বলে ফেললে আর বাতিল করা যায় না এবং লিখিত কিংবা মৌখিক, স্ত্রীকে শুনিয়ে কিংবা না শুনিয়ে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে, রাগান্বিত অথবা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় তালাক দিলেও তা পতিত হয়ে যায়। তাই শরিয়ত কর্তৃক নির্দেশিত প্রন্থায় স্ত্রীকে সতর্ক ও সংশোধন করার যেসব পদ্ধতি রয়েছে পর্যায়ক্রমে সেসব প্রয়োগ না করেই তালাক দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে কখনো তালাক দিলেও যেহেতু বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য এক তালাকই যথেষ্ট, তাই কোনো পরিস্থিতিতেই তিন তালাক না দেওয়া কর্তব্য । কেননা তিন তালাক দিলে আর স্বাভাবিকভাবে বিবাহের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। উপরন্তু এ কারণে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, যা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় থাকে না। আর যারা বলে একসাথে তিন তালাক দিলে এক তালাক পতিত হয়, রাগান্বিত কিংবা গর্ভাবস্থায় তালাক দিলে তালাক পতিত হয়না ইত্যাদি, তাদের এসব কথা সম্পূর্ণ ভুল ও কোরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি। তাই এসব কথা কর্ণগোচর করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করার চেয়ে পরকালের আজাব অনেক কঠিন। এই সংক্ষিপ্ত কথাগুলো ভালোভাবে বুঝার পর কথা হলো এই যে, প্রশ্নোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী প্রশ্নোল্লিখিত ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে “তুমি এক তালাক” বলার দ্বারা তার স্ত্রীর উপর এক তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে। অতঃপর শর্তযুক্ত করে “তিন তালাক” বলার পর উক্ত শর্ত পাওয়া যাওয়ার কারণে শরিয়তের দৃষ্টিতে আরো দুটি তালাক পতিত হয়ে সর্বমোট তিন তালাক পতিত হয়ে যাওয়ায় প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি ও তার স্ত্রী উভয়েই একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে । তাই তালাকের পর থেকে তাদের পরস্পরের মাঝে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক ছিল এবং পূর্বের ন্যায় দেখা-সাক্ষাৎ মেলামেশা তথা স্বামী-স্ত্রী সূলভ সকল প্রকার আচরণ তাদের জন্য সম্পূর্ণ হারাম ছিল। এখন স্বামীর জন্য কর্তব্য হল বিচ্ছেদবাচক শব্দ যেমনঃ আমি তোমাকে ছেরে দিলাম ইত্যাদি শব্দ ব্যাবহার করে পৃথক হয়ে যাওয়া এবং স্ত্রীর কর্তব্য হল ইদ্দত পালন করা। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী এখন তাদের পুনর্বিবাহ বৈধ নয়। তবে যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার পর প্রশ্নকারীর স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্কও হয়, তারপর ঐ স্বামী মারা যায় বা কোন কারণে তাকে তালাক দেয় তাহলে দ্বিতীয় স্বামীর তালাক বা মৃত্যুজনিত ইদ্দত পালনের পর প্রথম স্বামী ও তার স্ত্রী উভয়েই সম্মত থাকলে নতুন ভাবে মহর নির্ধারণ করে শরিয়তসম্মত পন্থায় পুনর্বিবাহ করতে পারবে। উপরোল্লিখিতি পদ্ধতি ছাড়া তাদের ঘর-সংসার করার অন্য কোন পথ বৈধ নয়। আর তালাকের পর প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর একসঙ্গে থাকা ও ঘর-সংসার করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ ছিল। এই জন্য তাদের খাটি দিলে তওবা ও ইস্তিগফার করা আবশ্যক । তবে তারা তাদের একসঙ্গে থাকাকে নিজেদের ধারনা অনুযায়ী বৈধ মনে করার কারণে পরবর্তীতে তাদের যে সকল সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের নসব সাব্যস্ত হবে তথা তারা বৈধ বংশ সম্পন্ন হিসেবে গণ্য হবে।
ﻗﺎل ﷲ ﺗﻌﺎﻟﻰ : فإن طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره فإن طلقها فلا جناح عليهما أن يتراجعا إن ظنا أن يقيما حدود الله وتلك حدود الله يبينها لقوم يعلمون. (سورة البقرة، الأية: 23) -
وفي الهداية: وإذا أضافه إلى شرط وقع عقيب الشرط مثل أن يقول لامرأته إن دخلت الدار فأنت طالق" وهذا بالاتفاق لأن الملك قائم في الحال والظاهر بقاؤه إلى وقت وجود الشرط فيصح يمينا أو إيقاعا. (باب الأيمان في الطلاق، ج:٣، ص:١٩٢، ط: مكتبة البشرى)-
وفيها أيضا: وإن كان الطلاق ثلاثا في الحرة أو ثنتين في الأمة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا ويدخل بها ثم يطلقها أو يموت عنها والأصل فيه قوله تعالى: ﴿فإن طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره﴾ فالمراد الطلقة الثالثة الخ. (كتاب الطلاق، باب الرجعة، ج:٣،ص:٢٢٦، ط: مكتبة البشرى)-
وفي البحر الرائق: أما إذا كان معلقا بالشرط فلا يصير الأمر بيدها إلا إذا جاء الشرط. (فصل في الأمر باليد، ج:٣، ص:٣٥١، ط: دار الكتاب الإسلامي)-
وفيه ايضا: ولأن التمكن على وجه الشبهة أقيم مقام حقيقة الوطء لخفائه ومساس الحاجة إلى معرفة الحكم في حق غيره، وفي الخلاصة المتاركة في النكاح الفاسد بعد الدخول لا تكون إلا بالقول كقوله تركتك أو ما يقوم مقامه كتركتها أو خليت سبيلها الخ. ( مبدأ العدة، ج:4، ص:159، ط: دار الكتب الإسلامي)-
وفي الفناوى الهندية : وإذا أضافه إلى الشرط وقع عقيب الشرط اتفاقا. (الفصل الثالث في تعليق الطلاق بكلمة إن وإذا وغيرهما، ج:١، ص:٤٢٠، ط: المطبعة الكبرى)-
وفي بدائع الصنائع: إذا وجد الشرط والمرأة في ملكه أو في العدة يقع الطلاق، وإلا فلا يقع الطلاق، ولكن تنحل اليمين لا إلى جزاء، حتى إنه لو قال لامرأته: إن دخلت هذه الدار فأنت طالق، فدخلت الدار وهي في ملكه - طلقت. (كتاب الطلاق، ج:٤، ص:٢٨٢، ط: مكتبة رشيدية)-
وفي رد المحتار: تحت (قوله: والموطوءة بشبهة) إن انعقاد الفراش بنفس العقد إنما هو بالنسب لأنه يحتاط في إثباته إحياء للولد. (مطلب عدة المنكوحة فاسدا والموطوءة بشبهة، ج:3، ص:517، ط: سعيد)-
وفيه أيضا: تحت (قوله: ومنه) أي من قسم الوطء بشبهة. قال في النهر: وأدخل في شرح السمرقندي منكوحة الغير تحت الموطوءة بشبهة. حيث قال: أي بشبهة الملك، أو العقد، بأن زفت إليه غير امرأته فوطئها، أو تزوج منكوحة الغير ولم يعلم بحالها. وأنت خبير بأن هذا يقتضي الاستغناء عن المنكوحة فاسدا إذ لا شك أنها موطوءة بشبهة العقد أيضا بل هي أولى بذلك من منكوحة الغير الخ. (مطلب عدة المنكوحة فاسدا والموطوءة بشبهة، ج:3، ص:517، ط: سعيد)-
وفی فتاوی دارالعلوم دیوبند: مطلقہ ثلاثہ سے بدون حلالہ کے دو بارہ نکاح کرنا حرام ہے اور معصیت ہے اور بعد نکاح جو اولاد ہوگا، نسب اس کا ثابت ہوگا احتیاطا فقط، (ج:11، ص:509، ط: دارالإشاعت)-