মুহাম্মদ বিন আব্দুল করিমের স্বপ্নসমূহের বিস্তারিত পর্যালোচনা ও তার প্রভাব—এসব কি সত্যিই শরয়ি ও শাস্ত্রীয় গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য? যখন নীতিগতভাবে দ্বীন, কুরআন, সহিহ হাদিস ও ফিকহ থেকেই গ্রহণ করা হয়, তখন স্বপ্নের ভিত্তিতে দ্বীনি দিকনির্দেশনা নেওয়া কতটুকু সঠিক? যদি মুহাম্মদ বিন আব্দুল করিম নিজে কখনো মাহদী হওয়ার কোনো দাবি না করে থাকেন, বরং ইমাম মাহদীর ছায়া দাবি করেন বা আবির্ভাবের আলামত, তবে তার স্বপ্নগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার শরয়ি ভিত্তি কী? কেবল এই যুক্তি কি যথেষ্ট যে তার কিছু স্বপ্ন “সত্য প্রমাণিত হচ্ছে”?
উম্মতের ভবিষ্যৎ সংকট, ফিতনা, মালহামাতুল কুবরা, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাজ্জাল ও বৈশ্বিক ঘটনাবলি সম্পর্কে কি স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, যখন গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই সীমাবদ্ধ? শেষ যুগে স্বপ্নের মাধ্যমে দিকনির্দেশনার কথা বলা হলে তার শরয়ি সীমারেখা কোথায়, এবং সেই সীমা অতিক্রম করে কি উম্মতের সামষ্টিক দিক নির্ধারণ করা বৈধ হতে পারে?
বিশ্বজুড়ে বহু মানুষ কাউকে “সত্যবাদী” বললে তা কি শরয়ি দলিল হয়ে যায়? মানুষের অভিজ্ঞতা, আবেগ ও ব্যক্তিগত সাক্ষ্য কি হুজ্জতে শরইয়ার মর্যাদা পেতে পারে? স্বপ্ন যদি কখনো বাস্তবধর্মী আবার কখনো প্রতীকী হয়, তবে তার চূড়ান্ত ও নির্ভুল ব্যাখ্যার অধিকার কার হাতে?
বয়স, বংশপরিচয় ও কিছু রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে স্বপ্নের মিল পাওয়া গেলে, তা কি এই সিদ্ধান্তকে অনিবার্য করে যে তার সব স্বপ্নই আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ ইশারা? হযরত ঈসা (আ.)-এর আগমন, ছোট যুদ্ধ থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা মালহামাতুল কুবরা, বিপুল প্রাণহানি এবং পরবর্তী শান্তিকাল—এসব বিষয় কি স্বপ্নের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়? কিছু ছোট যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলেই কি চার বছরব্যাপী বৈশ্বিক যুদ্ধ অবধারিত হয়ে যায়?
যদি মূল বার্তা হিসেবে বলা হয় শিরক নির্মূল না হলে আল্লাহর সাহায্য আসবে না, তবে এই বক্তব্য কি স্বপ্নভিত্তিক দাবির মাধ্যমে উম্মতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারে? কোনো স্বপ্ন ভবিষ্যতে সত্য প্রমাণিত হলে কি সেটি শরয়ি দলিলের মর্যাদা পেয়ে যায়?
ইমাম মাহদী সম্পর্কে হাদিসে এসেছে যে আল্লাহ তাকে এক রাতেই সংশোধন করবেন—তাহলে কি তার আগের আমল, আকিদা, দ্বীনি অবস্থান ও প্রকাশ্য সুন্নাহ পালনের ঘাটতি উপেক্ষা করা যাবে? হাদিসে কি কোথাও বলা হয়েছে যে সাধারণ মানুষ বা আলেমরা কেবল স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে কাউকে মাহদী হিসেবে গ্রহণ করবে?
নাম ও বংশের যুক্তি হিসেবে বলা হয়—নাম রাসূল ﷺ-এর নামের মতো হবে, পিতার নাম অর্থের দিক থেকে মিললেই যথেষ্ট—এই ব্যাখ্যাগুলো কি সুস্পষ্ট সহিহ হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, নাকি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনুমানভিত্তিক ব্যাখ্যা? একইভাবে, মাহদী আরব হওয়া শর্ত নয়—এই দাবি কি সরাসরি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, নাকি বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা?
বিভিন্ন মানুষের স্বপ্নে রাসূল ﷺ-কে দেখা এবং তাতে কোনো ব্যক্তির সত্যতা প্রমাণ—এসব কি শরয়ি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ? বহু মানুষ এক কথা বললেই কি তা হুজ্জত হয়ে যায়?
আলেমদের বক্তব্য অনুযায়ী কাবার কাছে বাই‘আত, আক্রমণকারী বাহিনীর ধ্বংস এবং শাসকদের বড় অন্তর্দ্বন্দ্ব—এসব বড় আলামত এখনো প্রকাশ পায়নি; তাহলে এসব সুস্পষ্ট আলামত ঘটার আগেই স্বপ্ন, বয়স, বংশ ও ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে মুহাম্মদ বিন আব্দুল করিমকে মাহদী হিসেবে সম্ভাব্য ধরে জনমত গঠন করা কি ফিতনার পথ খুলে দেয় না?
“মাশরিক থেকে আগমন”—এই শব্দের ব্যাখ্যা কি নির্দিষ্ট কোনো দেশ, যেমন পাকিস্তান, পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা যায়, নাকি ঐতিহাসিকভাবে শাম, ইরাক ও উপমহাদেশসহ বিস্তৃত অঞ্চলকে বোঝায়? সমসাময়িক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এতে ফিট করানো কি শরয়ি পদ্ধতি?
হাদিসে বলা হয়েছে, ইমাম মাহদী (আ.) বায়আতের আগে একজন সাধারণ ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে থাকবেন—তাহলে কি এই সাধারণত্বকে ভিত্তি করে তাঁকে আগেই চিহ্নিত করার দাবি করা যায়, নাকি স্পষ্ট ও অবিসংবাদিত আলামত ছাড়া এ দাবি কেবল অনুমানই থেকে যায়?
স্বপ্ন সম্পর্কে হাদিসে যে সত্যতার কথা এসেছে, তা কি ব্যক্তিগত সান্ত্বনা ও সুসংবাদের জন্য, নাকি উম্মতের নেতৃত্ব নির্ধারণ ও আকিদাগত সিদ্ধান্তের জন্য? বহু মানুষের স্বপ্ন একই দিকে ইঙ্গিত করলেই কি তা হুজ্জতে শরইয়া হয়ে যায়?
৪০ বছর বয়সে সূচনা ও ৫১–৫২ বছরে বায়আতের মতো বয়সভিত্তিক দাবিগুলো কি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত (কাসেম বিন আব্দুল করিমের জন্ম ১৯৭৬ এর ৫ জানুয়ারি, ৫১–৫২ বছর বয়স), নাকি দুর্বল ও অপ্রামাণ্য বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে? বয়স, সময় ও ঘটনাবলির আংশিক মিল কি সত্যতা নির্ধারণের শরয়ি মানদণ্ড হতে পারে?
অতএব চূড়ান্ত প্রশ্ন হলো—যেসব সুস্পষ্ট ও নিশ্চিত আলামত এখনো প্রকাশ পায়নি, সেগুলোর আগে স্বপ্ন, ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা, বয়স, বংশ ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে মুহাম্মদ বিন আব্দুল করিমকে মাহদী হিসেবে সম্ভাব্য ধরে নেওয়া কি উম্মতের জন্য হিদায়াত, নাকি স্পষ্ট ফিতনার সূচনা?
প্রশ্নোল্লিখিত তথ্য এবং লোকটির ব্যাপারে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি ইমাম মাহদী নন এবং তার আভাসও নন। কেননা হাদিসে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যসমূহ তার মধ্যে পাওয়া যায় না। নিম্নে তার কিছু বিশ্লেষণ দেওয়া হল—
1. উদ্ভব ও বয়স: হাদিসে আছে, ইমাম মাহদী (আ.) ৪০ বছর বয়সে প্রকাশিত হবেন এবং মতান্তরে সাত বা নয় বছর শাসন করে ইন্তেকাল করবেন। কিন্তু এই ব্যক্তি ৫২ বছরে উপনীত হয়েছে। অর্থাৎ ১২ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে।
2. খিলাফতের স্থান: ইমাম মাহদী হারাম শরীফে, রুকন ও মাকামে ইব্রাহিমের মধ্যবর্তী স্থানে ৪০ বছর বয়সে আত্মপ্রকাশ করবেন এবং সকল মুসলিম বরফের পাহাড় হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাঁর হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করবেন। অথচ এই ব্যক্তি বর্তমানে পাকিস্তান থেকেই প্রচার ও পরিচালনা করছে।
3. যুদ্ধ: হাদিস অনুযায়ী, ইমাম মাহদী নাসারাদের সঙ্গে বিশাল বাহিনী নিয়ে বৃহৎ যুদ্ধ করবেন। কিন্তু প্রশ্নোল্লিখিত ব্যক্তির কার্যক্রম সীমিত।
4. সহশাসন: হাদিসে এসেছে, ইমাম মাহদী ও হযরত ঈসা (আ.) একসঙ্গে দুই বছর রাজত্ব করবেন। অতঃপর মতান্তরে ৪৭–৪৮–৪৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করবেন; কিন্তু এখানে সাত থেকে এগারো বছর অতিবাহিত হলেও ঈসা (আ.)-এর আবির্ভাব ঘটেনি।
5. নাম ও বংশ: হাদিসে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, ইমাম মাহদীর নাম হবে “মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ”। অথচ উপস্থাপিত ব্যক্তির নাম কাসেম এবং বাবার নাম আব্দুল করিম।
6. অঞ্চল ও প্রকাশ: হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ইমাম মাহদী পূর্ব দিকের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রকাশ হবেন এবং ইঙ্গিত করেছেন মদিনা শহরের প্রতি। কিন্তু এখানে উল্লেখিত অঞ্চলের সাথেও মিল নেই।
7. তিনি হলেন: মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-ফাতেমী আল-হাসানী। অথচ তাহকীক অনুযায়ী এই ব্যক্তি নবীর বংশধর নন।
মোটকথা: প্রশ্নোল্লিখিত লোকটি ইমাম মাহদী না হওয়ার উল্লিখিত কারণগুলো দ্বারা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে উল্লিখিত ব্যক্তি ইমাম মাহদীও নন এবং তাঁর আগমনের আভাসও নন।
كما في سنن أبي داود: عن أم سلمة زوج النبي صلى الله عليه وسلم، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال يكون اختلاف عند موت خليفة، فيخرج رجل من أهل المدينة هاربا إلى مكة، فيأتيه ناس من أهل مكة فيخرجونه وهو كاره، فيبايعونه بين الركن والمقام، ويبعث إليه بعث من الشام فيخسف بهم بالبيداء بين مكة والمدينة، فإذا رأى الناس ذلك أتاه أبدال الشام وعصائب أهل العراق، فيبايعونه، ثم ينشأ رجل من قريش أخواله كلب فيبعث إليهم بعثا فيظهرون عليهم، وذلك بعث كلب، والخيبة لمن لم يشهد غنيمة كلب، فيقسم المال ويعمل في الناس بسنة نبيهم صلى الله عليه وسلم، ويلقي الإسلام بجرانه إلى الأرض فيلبث سبع سنين، ثم يتوفى ويصلي عليه المسلمون. قال أبو داود: وقال بعضهم عن هشام: تسع سنين. وقال بعضهم: سبع سنين. (کتاب الفتن، باب فی ذکر المہدی، ج:2، ص:239، الرقم:4286، ط: المكتبة الوحيدية)-
وفي سنن الترمذي: عن عبد الله قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «لا تذهب الدنيا حتى يملك العرب رجل من أهل بيتي يواطئ اسمه اسمي». (باب ما جاء في المهدي، ج:4، ص:505، رقم:2230، ط: شركة مكتبة ومطبعة مصطفى البابي الحلبي، مصر)-
وفيه أيضا: عن أبي سعيد الخدري، قال: «خشينا أن يكون بعد نبينا حدث، فسألنا نبي الله صلى الله عليه وسلم فقال: إن في أمتي المهدي» يخرج يعيش خمسا أو سبعا أو تسعا - زيد الشاك - قال: قلنا: وما ذاك؟ قال: سنين. قال: فيجيء إليه رجل فيقول: يا مهدي أعطني أعطني، قال: فيحثي له في ثوبه ما استطاع أن يحمله. (أبواب الفتن عن رسول الله صلى الله عليه وسلم، ج:٤، ص:506، رقم:٢٢٣٢، ط: شركة مكتبة ومطبعة مصطفى البابي الحلبي، مصر)-
وفي سنن أبي داود: قَالَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ - وَنَظَرَ إلَى ابْنِهِ الْحَسَنِ - فَقَالَ: "إنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ، كَمَا سَمَّاهُ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم -، وَسَيَخْرُجُ مِنْ صُلْبِهِ رَجُلٌ يُسَمَّى بِاسْم نَبِيّكُمْ - صلى الله عليه وسلم -، يُشْبِهُهُ في الْخُلُقِ وَلَا يُشْبِهُهُ في الْخَلْقِ". ثُمَّ ذَكَرَ قِصَّة: يَمْلأُ الأَرْضَ عَدْلًا. (كتاب المهدي، ج:١٢، ص:٣٣٢، ط: المكتبة الوحيدية)-
وفيه أيضا: عن أم سلمة رضي الله عنها قالت: سمعت رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم يقول: المهدي من عترتي من ولد فاطمة. (كتاب المهدي، ج:٦، ص:٣٤١، رقم:٤٢٨٣، ط: دار الرسالة العالمية)-
وفي سنن ابن ماجه: عن عبد الله، قال: بينما نحن عند رسول الله صلى الله عليه وسلم، إذ أقبل فتية من بني هاشم، فلما رآهم النبي صلى الله عليه وسلم، اغرورقت عيناه وتغير لونه، قال، فقلت: ما نزال نرى في وجهك شيئا نكرهه، فقال: «إنا أهل بيت اختار الله لنا الآخرة على الدنيا، وإن أهل بيتي سيلقون بعدي بلاء وتشريدا وتطريدا، حتى يأتي قوم من قبل المشرق معهم رايات سود، فيسألون الخير، فلا يعطونه، فيقاتلون فينصرون، فيعطون ما سألوا، فلا يقبلونه، حتى يدفعوها إلى رجل من أهل بيتي فيملؤها قسطا، كما ملئوها جورا، فمن أدرك ذلك منكم، فليأتهم ولو حبوا على الثلج». (باب خروج المهدي، ج:٢، ص:١٣٦٦، رقم:٤٠٨٢، ط: دار إحياء الكتب العربية)-
وفي بذل المجهود في حل سنن أبي داود: قال علي - رضي الله عنه -، ونظر إلى ابنه الحسن فقال: إن ابني هذا سيد كما سماه النبي - صلى الله عليه وسلم -، وسيخرج من صلبه) فيكون الحسنُ جَدَّه أبا أبيه، والحسين جده أبا أمه (رجل يسمى باسم نبيكم - صلى الله عليه وسلم -) أي محمد (يشبهه في الخُلُق) أي في أخلاقه العالية (ولا يشبهه في الخَلْق) أي في ظاهر الصورة (ثم ذكر قصة: يملأ الأرض عدلًا). (كتاب المهدي، ج:١٢، ص:٣٣٣، ط: المكتبة الوحيدية)-