আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ! মুহতারাম মুফতি সাহেব! আমি একজন প্রবাসী। আমার স্ত্রীর সাথে ফোনে কিছু কথা হয়। যা আমি হুবুহু তুলে ধরছি। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম তুমি যে এত পাগলামি কর তাতে কি আমার সম্মান বাড়ছে। তাতে আরও পুরো সমাজের কাছে আমাকে অসম্মান করছ। তুমি স্ত্রী হয়ে স্বামীর সম্মান রক্ষা করতে পারো না । স্বামীর কষ্টকে মুল্য দিতে পারো না। তখন আমার স্ত্রী বললো তোমার কিসের সম্মান গেছে? সম্মান গেলে আমার বাপের গেছে। তোমার কিসের সম্মান।
তখন আমি বললাম তুমি আমার স্ত্রী হয়ে স্বামীর সম্মান বুঝ না। তাহলে তুমি কেমন স্ত্রী? স্ত্রী তখন বলল অন্য মেয়ের স্বামী তার স্ত্রীকে দুই ভরি ওজনের স্বর্ন কিনে দিয়েছে, দামি খাট কিনে দিয়েছে তুমি কি দিয়েছো? তোমার মতো বেডার সংসারে আমি যাবো না।আমি তোমার ভাত খাবো না। তখন আমি বললাম তুমি অন্য জনের তুলনা করতাছ তোমার স্বামীর সাথে? ঠিক আছে তুমি যখন ভাত খাবেনা বা সংসার করবেনা ; তাহলে তুমি তিন মাস থাকো। তার পরে ব্যবস্থা করবো। হঠাৎ করে তো আর সবকিছু হয় না। যেহুতু তোমার এতই আপত্তি সংসার করতে। তখন স্ত্রী বলল তিন মাস বুঝি না আমাকে এই মুহুর্তে তালাক দিবা। দেখি তুমি কেমন বেডা। তুমি বেডা হইলে এই মুহূর্তে তালাক দিবা। এভাবে আট নয় বার সে আমার কাছ থেকে তালাক চায়। আমাকে বাধ্য করে তালাক দিতে। তখন আমি রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে একটা সময় তালাক দিতে বাধ্য হই এবং তিন কথা বলি। আমি তাকে বলি তালাক, তালাক, তালাক । এখন মুফতি সাহেবের কাছে আমার জানার বিষয় হচ্ছে এই ঘটনার দ্বারা আমার স্ত্রীর উপর কোন তালাক পতিত হয়েছে কিনা? যদি হয়ে থাকে তাহলে কয়টি পতিত হয়েছে এবং এখন আমাদের জন্য করণীয় কী? কিছু লোক বলতেছে মোবাইলে বিয়ে করলে যেমন বিয়ে হয়না। বরং দেশে এসে পুনরায় বিয়ে করতে হয়। ঠিক তেমনি ভাবে তালাকও বিদেশ থেকে হবে না। তাদের কথা কতটুকু সঠিক? অনুগ্ৰহ করে দলিল প্রমাণ সহ জানানোর অনুরোধ রইলো।
বিবাহিত প্রত্যেক নারী পুরুষের জন্য বিবাহ, তালাক ও দাম্পত্য সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের শরীয়তের মৌলিক বিধান জেনে নেওয়া আবশ্যক। এক্ষেত্রে অবহেলা করা গুনাহ। উপরন্ত এ বিষয়ে অবহেলা সংসার জীবনে অনেক সময় কঠিন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গুনাহ ও বিপদ থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ হলেও শরীয়তের বিধান জেনে নেওয়া কর্তব্য। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তাদের মাঝে গভীর ভালোবাসা বিশেষভাবে কাম্য। কেননা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রভাব পরিবার, সংসার, সন্তানসহ আরো অনেক কিছুর উপর পড়ে। আর কোন সন্দেহ নেই যে, দাম্পত্য হলো দ্বী-পাক্ষিক সম্পর্ক হওয়ার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আন্তরিকতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে একে অপরকে ছাড় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যত্যয় ঘটলে পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। এমনকি তা কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাক পর্যন্ত গড়ায়। উল্লেখ্য, শরীয়তে তালাক মোটেও কাম্য নয়। এজন্যই শরীয়তে তালাককে বৈধ কাজের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ বলা হয়েছে। আর তালাক এমন স্পর্শকাতর বিষয় যা বলে ফেললে আর বাতিল করা যায় না এবং লিখিত কিংবা মৌখিক, স্ত্রীকে শুনিয়ে কিংবা না শুনিয়ে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, এমনকি ঠাট্টাচ্ছলে, রাগান্বিত হয়ে কিংবা নেশাগ্রস্থ অবস্থায় অথবা বাধ্য হয়ে চাপে পড়ে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে দিলেও তা পতিত হয়ে যায়। চাই স্ত্রী হায়েজ অবস্থায় থাকুক অথবা পবিত্র অবস্থায় থাকুক। তাই শরীয়ত কর্তৃক নির্দেশিত পন্থায় স্ত্রীকে সতর্ক ও সংশোধন করার যেসব পদ্ধতি রয়েছে, পর্যায়ক্রমে সেসব প্রয়োগ না করেই তালাক দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে কখনো তালাক দিলেও যেহেতু বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য এক তালাকই যথেষ্ট, তাই কোন পরিস্থিতিতেই তিন তালাক না দেওয়া কর্তব্য। কেননা তিন তালাক দিলে আর স্বাভাবিকভাবে বিবাহের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। উপরন্ত এ কারণে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা থেকে উত্তরণের কোন উপায় থাকে না। আর যারা বলে একসাথে তিন তালাক দিলে এক তালাক পতিত হয়, গর্ভবস্থায় তালাক দিলে তালাক পতিত হয় না ইত্যাদি। তাদের এসব কথা সম্পূর্ণ ভুল ও কোরআন সুন্নাহ পরিপন্থী। তাই এসব কথা কর্ণগোচর করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক দুঃখ কষ্ট ভোগ করার চেয়ে পরকালের আজাব অনেক কঠিন।
এই কথাগুলো ভালোভাবে বুঝার পর কথা হলো এই যে, কোন ব্যাক্তি যদি তার স্ত্রীকে ফোনে তালাক দেয় এবং স্ত্রী কিংবা কোন সাক্ষী যদি উপস্থিত নাও থাকে অথবা তার তালাক দেওয়ার কথা যদি স্ত্রী কিংবা অন্য কেও নাও শোনে তবুও তালাক পতিত হয়ে যায়। সুতরাং প্রশ্নকারীর বর্ণনা অনুযায়ী তার স্ত্রীকে ফোনে তালাক, তালাক, তালাক বলার দ্বারা প্রশ্নকারীর স্ত্রীর উপর তিনও তালাক পতিত হয়ে প্রশ্নকারী ও তার স্ত্রী একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে গেছে।
তাই তালাকের পর থেকে তাদের পরস্পরের মাঝে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। এবং পূর্বের ন্যায় দেখা-সাক্ষাৎ, মেলামেশা, তথা স্বামী স্ত্রী সুলভ সকল প্রকার আচরণ তাদের জন্য হারাম। আর স্বামীর জন্য স্ত্রীর ইদ্দতকালীন সময়ের তথা তালাক পরবর্তী তিন মাসিক শেষ হওয়া পর্যন্ত গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত আর উভয়টির কোনটি না হলে তিন মাস পর্যন্ত খোরপোষ দেওয়া এবং মোহর (আংশিক কিংবা পূর্ণ) আদায় না করে থাকলে তা আদায় করা ওয়াজিব। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এখন তাদের বিবাহ বৈধ নয়। তবে যদি তিন তালাকের ইদ্দত শেষ হওয়ার পর, স্ত্রী অন্য কোন পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয় তারপর ওই স্বামী মারা যায় বা কোন কারনে তাকে তালাক দেয়, তাহলে দ্বিতীয় স্বামীর তালাক বা মৃত্যুজনিত ইদ্দত পালনের পর পূর্বের স্বামী ও সে উভয়ের সম্মত থাকলে নতুন করে মোহর নির্ধারণ করে শরীয়ত সম্মত পন্থায় বিবাহ করতে পারবে। এছাড়া এখন আর তাদের ঘর সংসার করার অন্য কোন পথ বৈধ নয় ।
قال الله تعالى: {فإن طلقها فلا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره فإن طلقها فلا جناح عليهما أن يتراجعا إن ظنا أن يقيما حدود الله وتلك حدود الله يبينها لقوم يعلمون} [سوره البقره:230]
وفي تفسير روح المعاني: فان تعقيبه للخلع, بعد ذكر الطلقتين يقتضي أن يكون طلقة رابعة, لو كان الخلع طلاقا . وإليه ذهب أصحابنا فحينئذ يكون {فان طلقها} فتعلق بقوله سبحانه وتعالى {الطلاق مرتان} [ج:12 ص:737 ط:دار الحديث]
وفي صحيح البخاري: {عن عروة ابن الزبير أن عائشة (رضي) أخبرته وأن امراة رفاعة (رضي) جاءت إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم. فقالت: يا رسول الله! إن رفاعة طلقني, فبدت طلاقي وإني نكحت بعده عبد الرحمن(إلى قوله) "قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لعلك تريدين أن ترجعي إلى رفاعة, لا حتى يذوق عسيلتك وتذوق عسيلته"} [باب من أجاز الطلاق الثلاث, ج:3 ص:2182 ط: مكتبة الإسلامية]
وفي سنن الترمذي: عن أبي هريره رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ثلاث جدهن جد وهزلهن جد: النكاح والطلاق والرجعة [ باب ما جاء في الجد والهزل في الطلاق, ج:2 ص:697 ،رقم :1168ط: مكتبة الإسلامية]
وفي الهدايه: وإن كان الطلاق ثلاثا في الحرة أو ثنتين في الأمة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا, يدخل بها ثم يطلقها أو يموت عنها. والأصل فيه قوله تعالى: {فان طلقها فلا تحل له من بعده حتى تنكح زوجا غيره} والمراد الطلقة الثالثة [كتاب الطلاق, باب الرجعة:ج:3 ص:226 ط: البشرى]
وفي البدائع: وأما الطلقات الثلاث فحكمها الأصلي وهو زوال الملك و زوال حل المحليه أيضا حتى لا يجوز له نكاحها قبل التزويج بزوج آخر لقوله عز وجل: {فان طلقها فلا تحل} وسواء طلقها ثلاثا فتفرقا أو جملة واحدة. [كتاب الطلاق: ج:4 ص:407 ط: رشيدية]
وفي رد المحتار: فاذا قال "رها كردم" أي "سرحتك" يقع به الرجعي مع أن أصله كناية أيضا وما ذاك إلا أنه غلب في عرف الناس استعماله في الطلاق. فقد مر أن صريح ما لم يستعمل إلا في الطلاق من أي لغة كانت. [كتاب الطلاق:ج:4 ص:530، ط:دار المعرفة]
وفي الفقه الإسلامي وأدلته: والبائن بينونة كبرى: وهو الذي لا يستطيع الرجل بعده ان يعيد المطلقة إلى الزوجية إلا بعد أن تتزوج بزوج آخر زواجا صحيحا, ويدخل بها دخولا حقيقا ثم يفارقها أو يموت عنها وتنقض عدتها منه وذلك بعد الطلاق الثلاث حيث لا يملك الزوج أن يعيد زوجيته إليه إلا إذا تزوج بزوج آخر [كتاب الطلاق: ج:7 ص:414، ط: رشيدية]
وفی فتوی عثمانی: اور نیند کی حالت میں طلاق واقع نہیں ہوتی بلکہ تمام صورتوں میں حنفی مسلک کے لحاظ سے طلاق ہو جاتی [ج:2، ص:315، ط:معارف القرآن]
وفی کتاب النوازل: اور طلاق بائن کا مطلب یہ ہوتا ہے کہ عدت کے اندر یا عدت کے بعد نکاح جدید کے بغیر بیوی سے رجوع کا حق نہ رہے بائنہ ہی کی ایک قسم مغلظہ (تین طلاقیں) ہیں جن میں حلالہ کی بغیر رجوع کا حق نہیں رہتا. اگر ایک یا دو طلاق بائن دی جائے تو نکاح جدید کے لیے حلالہ کے صورت نهی هوتی ہے [طلاق صريح ,حکم الصريح، ج:9، ص:251، ط:دارالاشاعت]
وفی فتوی رحیمیہ اور طلاق کے لیے گواہوں کا ہونا شرط نہیں ہے بلا گواہ ہوں کے بھی طلاق واقع ہو جاتی ہے [ کتاب الطلاق: ج 3 و ص 242 ط: داراشاعت]